শনিবার   ১১ জুলাই ২০২০   আষাঢ় ২৬ ১৪২৭   ২০ জ্বিলকদ ১৪৪১

৪১

করোনা জয় করে এখন প্লাজমা দিতে প্রস্তুত তারা

প্রকাশিত: ২ জুন ২০২০  

অন্যান্য দিনের মতো রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের গেটে ডিউটি করে আসছিলেন কনস্টেবল রহিমা আক্তার কাকলী। এপ্রিলের মাঝামাঝি তার শরীরে করোনার উপসর্গ দেখা দেয়। এর পরপরই নমুনা পরীক্ষায় ১৯ এপ্রিল তার রিপোর্ট পজিটিভ আসে। ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) যে দুই নারী পুলিশ সদস্য প্রথম করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদের একজন কাকলী। অন্য একজন হলেন তার সহকর্মী কনস্টেবল তাসনিম সাহেরা। তারা দু'জন ডিএমপির কল্যাণ ও ফোর্স শাখায় কর্মরত। কাকলী ও সাহেরার পরপরই উম্মে হাবিবা যূথী ও আঁখি আক্তারও করোনায় আক্রান্ত হন। তারা সবাই রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে একই ব্যারাকে থাকতেন। এই চার নারী পুলিশ সদস্য করোনাকে জয় করে এখন প্লাজমা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। চারজনই তাদের অভিজ্ঞতার কথা সমকালের কাছে তুলে ধরেন।

কনস্টেবল কাকলী গতকাল সমকালকে জানান, করোনার পজিটিভ রিপোর্ট পাওয়ার পরপরই প্রথমে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। কারণ তখনও পুলিশে আর কোনো নারী সদস্য আক্রান্ত হননি। ২০ এপ্রিল রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ভর্তির পর পরিবারের সদস্য, সহকর্মীরা অনেক সাপোর্ট দিয়েছেন। চিকিৎসক ও নার্সরা সাধ্যমতো সেবা দিয়ে গেছেন। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপারে কাকলী বলেন, 'রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের গেটে ডিউটি করতাম, কত লোক আসা-যাওয়া করেন। কার মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছি কীভাবে বুঝব। ২০ মে সুস্থ হয়েছি। এরপর ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে ছিলাম। কোয়ারেন্টাইন শেষে ছুটি নিয়ে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় গ্রামের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে আছি। ছুটি শেষে আবার কাজে ফিরব। মানুষের সেবা করে যাব। আর প্লাজমা দিতেও প্রস্তুত। যদি একজনের জীবন বাঁচাতে পারি- এর চেয়ে আনন্দের কী আছে!'

করোনাজয়ী আরেক নারী পুলিশ সদস্য হলেন তাসনীম সাহেরা। তার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের পার্বতীপুরে। তিনি রয়েছেন ডিএমপির কল্যাণ ও ফোর্স শাখায়। সাহেরা বলেন, '১৯ এপ্রিল করোনা ধরা পড়ে আমার। পুলিশের নারী সদস্যদের মধ্যে সবার আগে করোনা অ্যাটাক হওয়ায় সবচেয়ে বেশি সাহস ও সমর্থন পেয়েছি। তবে শুরুর দিকে আক্রান্ত হওয়ায় অজানা নানা শঙ্কা চেপে ধরেছিল।'

সাহেরা জানান, রাজারবাগে প্রশাসনিক ভবনের অভ্যর্থনা কক্ষে তার ডিউটি ছিল। করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরপরই প্রথমে তার বোন নূর আনাকে জানান। নূর আনা পেশায় সিনিয়র স্টাফ নার্স। বোনের পরামর্শে সাহেরা বিষয়টি তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান। পরে তার করোনা টেস্ট করানো হয়।

সাহেরা বলেন, 'পুলিশে যে ব্যারাক ব্যবস্থাপনা সেখানে অনেক সময় চাইলেও নিজেকে ছোঁয়াচে রোগ থেকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে ওঠে। একজনের বিছানা আরেকজনের সঙ্গে লাগানো থাকে।'

করোনাজয়ী আরেক পুলিশ সদস্য উম্মে হাবিবা যূথী জানান, সাহেরা ও কাকলীর করোনা ধরা পড়ার পরপরই তার উপসর্গ দেখা দেয়। ২২ এপ্রিল জানতে পারেন, তিনি করোনায় আক্রান্ত। পরদিনই পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি হন।'

যূথী জানান, হাসপাতালে ভর্তির প্রথম দিনই তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে। শ্বাসকষ্টে টানা ৫ ঘণ্টা তাকে অক্সিজেন নিতে হয়েছিল। একপর্যায়ে ওই রাতেই আইসিইউতে নেওয়া হয়। পরে ধীরে ধীরে তার অবস্থা ভালো হতে থাকে।

যূথী জানান, হাসপাতালে ভর্তির পর কিছু সময়ের জন্য মনে হয়েছে এ দফায় আর বেঁচে ফিরব না। পরিবারের লোকজনকে ফোন করে দোয়া করতে বলেছিলাম। সবার ভালোবাসা, দোয়ায় বেঁচে গেছি। তার ভাষ্য, উপসর্গ না লুকিয়ে যাতে সবাই টেস্ট করান, এটা জরুরি। আর করোনা হলেই বাঁচা যাবে না, এটা যাতে কেউ না ভাবেন। করোনাজয়ী আরেক পুলিশ সদস্য আঁখি আক্তার জানান, রাজারবাগ ছাড়াও মিরপুর, গুলশানসহ ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে চেকপোস্টে ডিউটি করতেন তিনি। বাইরে ডিউটি করার সময় কোনোভাবে আক্রান্ত হন। চিকিৎসাধীন থাকার সময় চিকিৎসক, নার্সসহ সবার সমর্থন দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে। ভর্তির পর শুরুর দিকে হাসপাতালের সেবার ব্যাপারে কিছুটা ব্যত্যয় হয়। পরে ধীরে ধীরে সব ঠিকঠাক চলতে থাকে।

আঁখি জানান, ব্যারাকে ওয়াশরুম ও বাথরুম আরও বাড়ানো দরকার। এমনকি ব্যারাকে পুলিশ সদস্যদের ঘনত্ব কমানোর ব্যাপারে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। ডাইনিং রুমের পরিসর আরো বিস্তৃত করা গেলে ভালো। ছোঁয়াচে রোগ থেকে বাঁচতে হলে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী কিছু বিষয় বদলে ফেলা জরুরি।

এই বিভাগের আরো খবর